Select Page

জয় বাংলা: একটি সমষ্টিগত স্বপ্ন

জয় বাংলা: একটি সমষ্টিগত স্বপ্ন

“সমষ্টিগত স্বপ্ন ছাড়া কোনো জাতি বাঁচতে পারে না। এমনকি টিকে থাকাও কঠিন।” — সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালী ভাগ হয়ে গেল। সৃষ্টি হলো পাকিস্তান। এই বিভক্তির পেছনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজনীতির ভূমিকা ছিল; ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল তার উর্বর ভূমি। কিন্তু সেই উর্বর ভূমিতেই অল্পদিনের মধ্যে দেখা দিল আত্মপরিচয়ের সংকট—নব্য পাকিস্তানে।

মানুষ তো শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসে বাঁচে না; বাঁচে তার কুলাচারে, আহারে-বিহারে, ভাষায়, সংস্কৃতিতে। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টির কয়েক বছরের মধ্যেই আক্রমণ নেমে এলো বাঙালীর ভাষার ওপর। ভাষার সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক গভীর—কমবেশি সবাই জানি। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী বুঝে গেল, তাদের সামনে বিপদ। ঘোর বিপদ।

ভাষাকে কেন্দ্র করেই শুরু হলো অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম।

বিরোধটা ভাষার মধ্যে আর থেমে থাকল না। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীতের প্রচার-প্রসারে বিধিনিষেধ আরোপ করল। অখণ্ড বাংলায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব কতটা গভীর, তা বোঝার ক্ষমতা উর্দুভাষী শাসকগোষ্ঠীর ছিল না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। দেশের বুদ্ধিজীবীরাও এগিয়ে এলেন প্রতিবাদে।

ছায়ানটও সে সময় রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছিল; পরবর্তী সময়েও করেছে।

জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীকালে গানটির প্রথম দশ পংক্তি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়।

এই খণ্ড দৃশ্যগুলো সামনে আনার কারণ একটাই—এর গভীরে যে বাণী ছিল, তা অনেকের চোখ এড়িয়ে গেলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চোখ এড়িয়ে যায়নি। তারা এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে দেখতে পেয়েছিল জাতীয়তাবাদের জাগরণ।

সিদ্দিক সালিক তাঁর Witness to Surrender গ্রন্থে লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের ছড়িয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা বাঙালি ফৌজের সাথে সাথে সাধারণ জনগণের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল, যদিও জনগণের উপরই এটা বেশি স্পষ্টভাবে ও দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছিল। এই চেতনাকে আরও উজ্জীবিত করে তুলতে আওয়ামী লীগের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিল যেন জাতীয় দিবসগুলো যেমন পাকিস্তান দিবস (২৩শে মার্চ), স্বাধীনতা দিবস (১৪ই আগস্ট), কায়েদ-এ-আজম-এর জন্ম ও মৃত্যবার্ষিকী (২৫শে ডিসেম্বর, ১১ই সেপ্টেম্বর)—এগুলোকে পালন না করে বরং প্রাদেশিক দিবসগুলো যেমন সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী, ভাষা দিবস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী—এই দিবসগুলোকে পালন করা হয়।” পৃষ্ঠা ২৬।

বাঙালীর জাতীয় জাগরণকে রুখে দেবার জন্য পাকিস্তানী শাসক ও এদেশীয় কিছু সমর্থক, বিশেষ করে জামাতে ইসলাম, মুসলিম লীগসহ আরো কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ‘ইসলাম’ ধর্মকে বর্ম হিসাবে ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয় নি, ভারত বিরোধী প্রচারণাও জোরদার করলো। বাঙালীর উপর শোষণ-পীড়নকে আড়াল করে রাখার জন্য ধর্ম আর ভারত বিরোধী প্রচারণা ছাড়া তাদের হাতে আর কিছু ছিল না। কিন্তু এতে করেও বাঙালীর জাগরণ রুখে দেয়া সম্ভব হলো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘জয় বাংলা’ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে সামনে আসে; পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তা হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান ও রণধ্বনি।

স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘জয় বাংলা’ কেবল একটি স্লোগান ছিল না—এটি ছিল দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একটি অভিন্ন স্বপ্নের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান।

‘জয় বাংলা’র ছায়াতলে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখতে পারত; নিজেদের পরিচয়, মর্যাদা ও ঐক্যের স্বপ্ন দেখতে পারত।

‘জয় বাংলা’ কেবল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হয়নি; দেশের বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির কাছ থেকেও এর বিরোধিতা এসেছে। যদিও তাদের বিরোধিতার কারণ ও উদ্দেশ্য পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতার সঙ্গে এক ছিল না—পার্থক্য ছিল মৌলিক। সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু ‘জয় বাংলা’ যে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির আক্রমণ ও বিরোধিতার মুখে পড়েছিল, তা সত্য।

স্বাধীনতার পর নানা সংঘাত ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ‘জয় বাংলা’র সেই সমন্বিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বনকারী বিভিন্ন শক্তি যেমন সক্রিয় ছিল, তেমনি সক্রিয় ছিল বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনও।

স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল মূলত অগ্রগণ্য এবং যে সংগঠনটি তখন ঐক্যবদ্ধ ছিল, স্বাধীনতার মাত্র দেড় বছরের মাথায় সেই ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধুও কেন তাদের আবার এক ছাতার নিচে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিলেন না—জানা নেই।

তারপর এলো নতুন এক অধ্যায়। শুরু হলো জয় বাংলার জয় যাত্রা থামিয়ে দেবার গভীর ষড়যন্ত্র।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার পর রাষ্ট্রীয় পরিসরে ‘জয় বাংলা’র অবস্থানও বদলে গেল। খন্দকার মোশতাক আহমদের আমলে ‘জয় বাংলা’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ব্যবহার, যা জিয়ার আমলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।

এরপর শুরু হলো ‘জয় বাংলা’র ঐক্যমূলের ওপর ধারাবাহিক আঘাত।

১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে সংবিধানের মৌলিক চরিত্রেও পরিবর্তন আনা হয়। জিয়াউর রহমানের আমলে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সংযোজিত হয়।

পাকিস্তান-ফেরত জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়।

দৃশ্যমান শত্রু ছিলো পাকিস্তান; কিন্তু এখন জাতীয়তাবাদের শত্রু অদৃশ্য, তাকে দেখা যায় না। আর এর রূপকার বিদেশী কেউ নয়, দেশী—পরিচয়ে বাঙালী। তাই বিরোধিতা করার জায়গা ছিলো না। শত্রু দেশ ছেড়ে চলে গেছে। ধর্ম এসেছে তার জায়গায়। অধিকাংশ বাঙালী মুসলিম, একে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রটিকেও ব্যবহার করা হচ্ছিল ইচ্ছেমতো। একাত্তরে পরাজিত শক্তিগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে সংগঠিত হয়েছে, জিয়ার আমলে, ইন্ধন পাচ্ছিলো রাষ্ট্রীয়ভাবে। খালেদা জিয়ার আমলে পায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগ। সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনে ও সামরিক বাহিনীতেও নিজেদের শক্তি গড়ে তোলে জামাতে ইসলাম।

দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফলে রচিত হলো ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়—২০২৪।

স্বাধীনতার সব অর্জনের উপর একের পর এক আঘাত আসতে থাকল। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত জাদুঘর, ভাস্কর্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আক্রান্ত হলো। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাঙচুর করা হলো; পরবর্তী সময়ে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক শিখা অনির্বাণ নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ইউনুসের আমলে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে ভাস্কর্য না বানিয়ে পানির ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার।

স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, বিচারের নামে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ও দলটির শীর্ষ নেতাদের গণহারে ফাঁসির রায় দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।

দলটির অসংখ্য নেতা-কর্মী আজ কারাগারে আটক।

জয় বাংলা স্লোগান বিএনপির সরকারের আমলেও অপরাধ হিসাবে বিবেচ্য।

অর্থাৎ, যে স্লোগান একসময় ভাষা, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে একসূত্রে গেঁথেছিল, তার রাষ্ট্রীয় অবস্থানও আবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেল।

প্রশ্নটি তাই শুধু ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহৃত হবে কি হবে না—সেটি নয়।

প্রশ্নটি আরও গভীর।

বাঙালির আত্মপরিচয় কী?

এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের অভিন্ন স্বপ্ন কী?

ধর্মের ঊর্ধ্বে, সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে, রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বে—কোন পরিচয় আমাদের একত্রে ধারণ করতে পারে?

“সমষ্টিগত স্বপ্ন ছাড়া কোনো জাতি বাঁচতে পারে না।” জয় বাংলার স্বপ্ন সমষ্টির, অর্থাৎ এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য আদিবাসী সেই সমষ্টির অন্তর্ভুক্ত।

মন্তব্য করুন

Subscribe to Blog via Email

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 4 other subscribers

সংরক্ষণাগার