Select Page

নবাব সলিমুল্লাহ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান ও বিরোধিতা

নবাব সলিমুল্লাহ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান ও বিরোধিতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তথা পূর্ববঙ্গের স্বার্থের প্রসঙ্গে নবাব সলিমুল্লাহ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মুখোমুখি করা, একজনকে মহান আরেকজনকে ভিলেন বানানোর রাজনীতি বাংলাদেশে চলছে অনেকদিন থেকে।

অন্য একটি বিস্তারিত কাজের উপজাত হিসেবে খুঁজে বের করলাম নবাব সলিমুল্লাহ ও রবীন্দ্রনাথের নিজেদের সম্পর্ক এবং তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহে তাঁদের ভূমিকা।

এর জন্য আমি এটাসেটার ওপর ভরসা না করে দুটি মূল দলিল পড়েছি। একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে থাকা নাথান কমিটির রিপোর্ট, অন্যটি ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের দিনলিপি। পাশাপাশি আকবর আলি খানের *দুর্ভাবনা ও ভাবনা: রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে*, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের *পিতৃস্মৃতি* এবং প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের *রবীন্দ্রজীবনী*।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নিয়ে দুজন অবশ্যই দুই মেরুতে ছিলেন। নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ ও আসাম নবাব সলিমুল্লাহকে নিঃসন্দেহে ক্ষমতায়িত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের কর্মসূচিতে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছিলেন। কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের প্রতি পূর্ববঙ্গের মানুষের অনীহা তাঁকে ভাবিয়েছে। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে এই আন্দোলন থেকে সরিয়ে নিয়ে এর সমালোচক হয়ে ওঠেন। পূর্ববঙ্গের মানুষের মনোভাবের প্রতি তাঁর সহানুভূতি তাঁর অনেকগুলো লেখাতেই উঠে এসেছে।

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ১৭ ও ২০ ডিসেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ ভাইসরয়কে দুটি চিঠি লেখেন। প্রথমটিতে ছিল ক্ষোভ, দ্বিতীয়টিতে পূর্ববঙ্গের মুসলমানের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানের দাবি। ১৯১২ সালের ২৯ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় এসে অন্যান্য বহুবিধ আলোচনার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেন। সলিমুল্লাহর এই অবদান মানতেই হবে, কারণ তাঁর দাবির প্রেক্ষিতেই এই প্রতিশ্রুতি এসেছিল। তবে এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া আরেকটি দাবি টেকে না। বলা হয়, সলিমুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি দান করেছিলেন। এই দাবি মিথ্যা। নাথান কমিটির রিপোর্ট জানাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬০০ একর জমি মূলত নতুন প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য নেওয়া হয়েছিল। প্রদেশ বাতিল হওয়ায় সেই জমিতেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সুতরাং নবাব সলিমুল্লাহর ভূমি দানের দাবিটি অসত্য। তাঁর গৌরব বাড়াতে মিথ্যা দাবি করতে হয় না। তাঁর দাবিতেই লর্ড হার্ডিঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এটুকুই যথেষ্ট।

এরপর বিরোধিতার প্রশ্ন। ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কলকাতার গভর্নমেন্ট হাউসে একটি প্রতিনিধিদল ভাইসরয়ের সঙ্গে দেখা করে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। দলের নেতা ছিলেন ডা. রাসবিহারী ঘোষ। সঙ্গে ছিলেন নয়জন: রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফরিদপুরের অম্বিকাচরণ মজুমদার, ত্রিপুরার (কুমিল্লা) এ. রসুল, রাজশাহীর কিশোরীমোহন চৌধুরী, ময়মনসিংহের দ্বারকানাথ চক্রবর্তী, ঢাকার শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী আর চট্টগ্রামের যাত্রামোহন সেন। এই প্রতিনিধিদল যেসব যুক্তি দেখান, স্বয়ং ভাইসরয় তা খারিজ করে দেন। এই বিরোধীতার ঘটনা ১৯১২ সালের, রবীন্দ্রনাথ এর বেশ আগেই নিজেক সরিয়ে নিয়েছেন পশ্চিম-পূর্বের রাজনীতি থেকে।

তাহলে ২৮ মার্চের সভার দাবি এল কোথা থেকে? এইটা খুব মজার। দাবির উৎস হিসেবে বারবার একটি বইয়ের নাম আসে। লেখক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন, বীরপ্রতীক, পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। বইয়ের নাম *আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা*। বইয়ে সভার তারিখ, স্থান আর সভাপতির নাম আছে, কিন্তু কোনো সূত্র নেই। এই বইয়ের কয়েকটি বাক্যই পরে সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট, সংবাদপত্রের লেখা আর কয়েকটি প্রবন্ধে হুবহু ফিরে এসেছে।

রবীন্দ্রনাথ তখন কোথায় ছিলেন? রথীন্দ্রনাথের *পিতৃস্মৃতি* ও প্রভাতকুমারের *রবীন্দ্রজীবনী* অনুযায়ী ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ তাঁর বিলেত রওনা হওয়ার কথা ছিল। জাহাজে ওঠার মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে তিনি যাত্রা বাতিল করেন। ২৪ মার্চ যান শিলাইদহে। ২৮ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে তারিখ ও স্থান লেখা আঠারোটি কবিতা ও গান শিলাইদহের। অর্থাৎ যেদিন কলকাতার গড়ের মাঠে তাঁর সভাপতিত্ব করার কথা বলা হচ্ছে, সেদিন তিনি কলকাতাতেই নেই।

১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন। খবর ঢাকায় পৌঁছাতেই নবাব সলিমুল্লাহ কবিকে অভিনন্দন জানিয়ে তারবার্তা পাঠালেন। ঢাকার সাহিত্য পরিষদ তখন এক বছরের পুরোনো, আর সলিমুল্লাহ ছিলেন তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ২৬ নভেম্বর পরিষদ ঢাকার জজ আদালত চত্বরে, বার লাইব্রেরির সামনে অভিনন্দন সভা ডাকল। অসুস্থ শরীরেও সভাপতিত্ব করলেন সলিমুল্লাহ। তাঁর ভাষণে “আধুনিক ভারতের শ্রেষ্ঠ কাব্যপ্রতিভা”র প্রতি শ্রদ্ধা ছিল। সলিমুল্লাহ মারা যান ১৯১৫ সালে। এর পরেও সম্পর্কের সুর কাটেনি। ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজে রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা দেয়, আর ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহ’র বড়পুত্র নবাব হাবিবুল্লাহর অতিথি ছিলেন।

সব মিলিয়ে যা পেলাম, তা এই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি তোলার পেছনে নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জমিদানের দাবি অসত্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছিল ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির প্রতিনিধিদল, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না।

২৮ মার্চের গড়ের মাঠের সভা আর রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বের দাবির একমাত্র উৎস একটি সূত্রহীন বই। হার্ডিঞ্জের দিনলিপি, নাথান কমিটির রিপোর্ট কিংবা সমকালীন কোনো প্রতিবেদনে এর প্রমাণ মেলে না, উল্টে ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহে থাকার তথ্য পাওয়া যায় তাঁর নিজের লেখার তারিখ ও জীবনীকারদের বিবরণে।

বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নে সলিমুল্লাহ ও রবীন্দ্রনাথ শুরুতে দুই মেরুতে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজের অবস্থান বদলেছিলেন। তিনি স্বদেশি আন্দোলনের সমালোচক হয়ে ওঠেন এবং পূর্ববঙ্গের মানুষের মনোভাবের প্রতি সহানুভূতিশীল হন। দুজনের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাও ছিল, নোবেল প্রাপ্তিতে সলিমুল্লাহর অভিনন্দন ও সভাপতিত্ব এবং পরে নবাব বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের আতিথ্য তার প্রমাণ।

সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী ও পূর্ববঙ্গের শত্রু বানানোর দাবি প্রমাণের কাছে টেকে না। আবার সলিমুল্লাহর প্রকৃত অবদান স্বীকার করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে খলনায়ক বানানোরও কোনো দরকার নেই।

যারা এসব সংকীর্ণতা করছেন তাঁরা রবীন্দ্রনাথ এবং নবাব সলিমুল্লাহ দুজনকেই ক্ষুদ্র করছেন। দুজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ক্ষুদ্র করছেন যাদের নিজেদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিলো।

২ Comments

  1. অনিরুদ্ধ মাসুদ

    “রবীন্দ্রনাথকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী ও পূর্ববঙ্গের শত্রু বানানোর দাবি প্রমাণের কাছে টেকে না। আবার সলিমুল্লাহর প্রকৃত অবদান স্বীকার করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে খলনায়ক বানানোরও কোনো দরকার নেই।”

    লেখকের এই কাথা বুঝবার বোধটুকু থাকলে আমাদের মানে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসবোধ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস – দুটোই বাঁচে।

    Reply
  2. অনিরুদ্ধ মাসুদ

    “রবীন্দ্রনাথকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী ও পূর্ববঙ্গের শত্রু বানানোর দাবি প্রমাণের কাছে টেকে না। আবার সলিমুল্লাহর প্রকৃত অবদান স্বীকার করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে খলনায়ক বানানোরও কোনো দরকার নেই।”

    লেখকের এই কাথা বুঝবার বোধটুকু থাকলে আমাদের মানে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসবোধ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস – দুটোই বাঁচে।

    Reply

মন্তব্য করুন

Subscribe to Blog via Email

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 4 other subscribers

সংরক্ষণাগার

%d bloggers like this: