Select Page

নাস্তিক রবীন্দ্রনাথ

নাস্তিক রবীন্দ্রনাথ

“সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।”… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু নিরীশ্বরবাদীই নন, তিনি একজন প্রকৃত নাস্তিক ছিলেন। আমার এই কথা নতুন এবং বিষয়টি প্রায়ই ভুল বুঝা হয়। তাই এই বিষয়ে কিছু আলোচনা করা দরকার।

রবীন্দ্রনাথ জগৎস্রষ্টা ব্যক্তি-ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি উপনিষদের ব্রহ্মে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু সেই ব্রহ্ম আসলে জগৎ (মন ও জড়ের অদ্বৈত) ছাড়া অন্য কিছু নয়, এই বিষয়ে ব্রহ্মসূত্র দ্রষ্টব্য যেখানে ব্রহ্ম ও জগৎকে এক (অনন্য) বলা হয়েছে। যখন কবি ‘ঈশ্বর’ শব্দটি ব্যবহার করেন তখন তিনি ব্রহ্ম অর্থেই করেন, ব্যক্তি-ঈশ্বর অর্থে নয়। তিনি বৈদিক যাগযজ্ঞাদি করতেন না; দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা ইত্যাদিও করতেন না। সুতরাং তিনি যে ভালরকম নাস্তিক, এই ব্যাপারটা বুঝা কিছু শক্ত নয়।

শাস্ত্রীয় অর্থে যে বেদ মানে সে আস্তিক, যে বেদ মানে না সে নাস্তিক। কেউ বেদ না মেনে ঈশ্বর মানলেও সে নাস্তিক, শাস্ত্র এই বিষয়ে পরিষ্কার। এখানে ‘বেদ মানা’ মানে ‘বেদের কর্মকাণ্ডকে মানা’ বুঝতে হবে। বেদে ঈশ্বরের কথা নেই, উপনিষদেও নেই। সত্যকে লাভ করাই উপনিষদের ঋষিদের উদ্দেশ্য। ঈশ্বর বা যাগযজ্ঞ নিয়ে তাঁরা মোটেই চিন্তিত নন। এমনকি উপনিষদের ঋষিরা যজ্ঞকে ফুটা নৌকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁরা ঈশ্বর মানেন না, যজ্ঞ মানেন না, শুধু ব্রহ্ম (অর্থাৎ জগৎ) মানেন। তা সত্ত্বেও ঐতিহ্যগতভাবে উপনিষদকে “আস্তিক” শাস্ত্র হিসাবে দেখেন, কিন্তু তার পিছনে যুক্তি পাওয়া যায় না। বেদের প্রথম দিককার অংশগুলির সঙ্গে উপনিষদের তফাৎ অনেক এবং উপনিষদকে আস্তিক শাস্ত্র মনে করাটা অযৌক্তিক ও ভুল ভাবনা। উপনিষদ নিজেই যখন যাগযজ্ঞকে অসার মনে করছে এবং ঈশ্বরের কথা না বলে সত্যকে বুঝার চেষ্টা করছে, তখন তাকে নাস্তিক শাস্ত্র বলা একান্তভাবে দরকার। উপনিষদকে আস্তিক বলা হয় কেবল ঐতিহ্যের চাপে এবং ব্রহ্ম কী তা ভাল ক’রে না বুঝার ফলে। এইভাবে আস্তিকতার দিকে ঝোল টানা হয়। এখানে মূল সমস্যাটি হল ব্রহ্ম কী তা বেশীরভাগ লোকেই ভাল বুঝেন না। সেই অবুঝ লোকদের মধ্যে দার্শনিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীরাও আছেন। তার ফলেই এত ভুল বুঝাবুঝি এবং ধর্ম নিয়ে এত সমস্য়া হয়। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু উপনিষদের ঋষিদের মতো প্রজ্ঞাবান তথা ব্রহ্মজ্ঞানী ছিলেন।

যেখানে ঈশ্বর মানলেও আস্তিক হয় না, সেখানে ব্রহ্ম (যা জগৎ ছাড়া অন্য কিছু নয়) মানলে আস্তিক হবার কোনো প্রশ্নই নেই— এটা খুব সোজা কথা। সুতরাং এখন থেকে উপনিষদের ঋষিদের নাস্তিক বলতে হবে এবং সেজন্য দর্শনের বইগুলিও সংশোধন করতে হবে। যদি উপনিষদের দর্শনকে আস্তিক দর্শন বলতে হয় তবে পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী নাস্তিক ব্যক্তিকেই আস্তিক বলতে হবে, কারণ তাঁরা সবাই জগৎ (=ব্রহ্ম) মানেন।

ব্রহ্ম বলতে জগৎকেই (মন ও জড়বস্তর অদ্বৈত) বুঝতে হবে, এই কথা ব্রহ্মসূত্রে পরিষ্কার বলা আছে। আস্তিক হতে গেলে শুধু ব্রহ্মজ্ঞান ( নিরীশ্বরবাদের জ্ঞান) থাকলেই হয় না, বরং বৈদিক যাগযজ্ঞাদি মানতে হয়। আজকের দিনেও আস্তিক হতে গেলে কমসে কম কালীপূজা, দুর্গাপূজা ইত্যাদি করতে হবে। স্বামী দয়ানন্দ মূর্তিপূজা না মানলেও যজ্ঞ মানতেন। তাঁকে আস্তিক বলা চলে, রবীন্দ্রনাথকে নয়।

আইনস্টাইন স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন, রবীন্দ্রনাথ তেমন ঈশ্বরও মানতেন না। তিনি মনে করতেন জগৎ কীভাবে চলছে তাতে মানুষের ভূমিকা আছে। আইনস্টাইন স্পিনোজার মতো অদৃষ্টবাদী ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তা ছিলেন না। স্পিনোজার ঈশ্বর মানুষের হাত-পা বেঁধে দেয়, তাতে কবিগুরুর বিশ্বাস ছিল না। এই বিষয়ে রবীন্দ্র-আইনস্টাইন বিতর্ক দ্রষ্টব্য। রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইনের চেয়ে গভীতর নাস্তিক, এই কথা বলা চলে।

ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে মনে করতেন। বুদ্ধ স্বয়ং বেশ ভালরকম নাস্তিক ছিলেন। বৌদ্ধ দর্শন ও উপনিষদের ব্রহ্মের (আমি আচার্য শঙ্করের কথা বলছি না) মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধ এই দুই মহামানব দার্শনিকভাবে প্রায় সমস্তরে বিরাজ করেন। রবীন্দ্রনাথকে নাস্তিক বুদ্ধের ভাবশিষ্য আর এক নাস্তিক বললে তাঁকে বুঝতে সুবিধা হবে। তাঁকে আস্তিক বলার মধ্যে অনেকের আবেগ জড়িয়ে থাকতে পারে, সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।

খুব গভীরে গেলে আস্তিক, নাস্তিক একই— এগুলো বাকবিকল্প মাত্র, একই শব্দতত্ত্বের নানা বিভাজিত প্রতীতি। চর্চার অভাবে এবং বাজারের প্রচলিত অভিধানগুলির সীমাব্ধতার কারণে সেই স্তরে সবাই যেতে পারেন না। ব্যবহারিক স্তরে রবীন্দ্রনাথকে ‘নাস্তিক’ আখ্যা দেওয়াই শ্রেয়। এর ফলে নাস্তিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে এবং তা সমাজে ধর্মমোহ দূরীকরণের সহায়ক হবে।

এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, রবীন্দ্রনাথের নাস্তিকতা আজকালকার কট্টর নাস্তিক ও কট্টর যুক্তিবাদীদের মতো নয়। চাইলে রবীন্দ্রনাথকে ‘আধ্যাত্মিক নাস্তিক’ বলা যেতে পারে। এখানে আত্মা মানে বিশ্বের প্রবাহ এবং আধ্যাত্মিক মানে যিনি সেই প্রবাহকে উপলব্ধি করেন। রবীন্দ্রনাথের নাস্তিকতা রসাত্মক ও ভাবাত্মক। হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান প্রভৃতি সব ধর্মের মানুষ রাবীন্দ্রিক নাস্তিকতার পাঠ নিতে পারেন।

যুক্তিবাদ, নাস্তিকতা ও মানবতাই আগামী পৃথিবীর ধর্ম। নাস্তিকরা সব ধর্মকে বুঝার চেষ্টা করুন। নাস্তিকতা কোনো ধর্মেরই শত্রু নয়, বরং তা হল সত্যের প্রকাশক। নাস্তিকতা ও অধ্যাত্মবাদের গভীরে কোনো বিরোধ নেই, এদের কোনোটাই মিথ্যার সঙ্গে আপোষ করতে বলে না। মতামত কাম্য। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Subscribe to Blog via Email

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 4 other subscribers

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সংরক্ষণাগার