Select Page

ইরান ও তৈলাক্ত তামাশা

ইরান ও তৈলাক্ত তামাশা

একটি বহুল প্রচলিত­ আইরিশ রসিকতা হল— যদি কোনওদিন দুই প্রতিবেশী বা দুই ভাইকে একে-অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখা যায়, তাহলে নিশ্চিত জানবে আগেরদিন সেখানে কোনও ইংরেজের আগমন ঘটেছিল! রসকিতা হলেও কথাটা ঘোর বাস্তব। ভারত-পাকিস্তান, ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ— উদাহরণ তো আর কম নেই! তবে আজ ইরানের কথা হবে। বহুদিন ধরেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার বিশেষ বনিবনা নেই। কিন্তু কেন? এই ইরানিরা কারা?

ইরান, অতীতের পারস্য। কিন্তু কারা এই পারসিক? পারস্যের ভুবনবিখ্যাত সম্রাট দারায়ুসের সমাধিতে লেখা আছে, ‘আমি একজন পারসিক, একজন পারসিকের পুত্র, একজন আর্য, আর্যবংশোদ্ভূত’। ঘটনাচক্রে এই ‘আর্য’ বা উচ্চারণভেদে ‘আরিয়ান’ থেকেই দেশটার বর্তমান নাম ‘ইরান’ হয়েছে। এই দারায়ুস তথা আদি পারসিককদের ধর্মের নাম ‘মাজদা য়াস্ন/ য়স্ন’। যেই ধর্মের প্রবর্তক জরাথুষ্ট্র। জরাথুষ্ট্রের গোত্রের নাম ‘স্পিতামা’। আবার অথর্ববেদের ভার্গব সংহিতা অনুসারে অসুরগণের গুরু শুক্রাচার্যের গোত্রও স্পিতামা!

ঋগ্বেদের বিভিন্ন সূত্রে ‘প্রভুত্বকারী’ বা ‘ইন্দ্র’ নামক সত্তার সঙ্গে ‘পার্শব’ নামক এক জনগোষ্ঠীর মতবিরোধ, যুদ্ধ, ইত্যাদির উল্লেখ আছে। সম্ভবত, বৈদিক যুগের শেষদিকে পার্শবেরা একসময় নিজের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়। এই পার্শবেরাই আদি পারসিক। তাদের ধর্মগ্রন্থের নাম ‘আবেস্তা’ বা ‘আর্যদের স্থান’। আবেস্তা অনুযায়ী তাদের জন্মস্থানের নাম ‘হপ্তহিন্দু’ (সপ্তসিন্ধু বা উত্তর ভারত)। এর পাশাপাশি এই গ্রন্থে ‘হারখাওয়াতি’ নামের এক নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন পারস্য বা আধুনিক ইরানে এই নামের কোনও নদী পাওয়া যায়নি। ‘হারখাওয়াতি’ আসলে বৈদিক সরস্বতী নদীরই উচ্চারণভেদ। পার্শবেরা ইন্দ্রকে শয়তান বলে (১০.৯)। আবেস্তায় সমস্ত কর্মের দু’টি চালিকা শক্তির নির্দেশ পাওয়া যায়,‒ ‘আহুর মাজদা’  (শুভ শক্তি) ও ‘অঙ্গর মইন্যু’ (অশুভ শক্তি)।

আবেস্তা ও বেদ পৃথক ভাষায় রচিত হলেও এই ভাষাদু’টির উৎস এক। যেই কারণে এই দু’টি ভাষার অজস্র শব্দে ধ্বনিগত বা phonetic সাদৃশ্য দেখা যায়। মহাভারতে ‘পার্শব’-এর বদলে ‘পারশব’ বানানটা পাওয়া যায় (বিদুরের পরিচয় হিসেবে)। এটা আসলে বৈদেহক, অম্বষ্ঠ, সূত, আরোগব, মাহিষ্যের মতো পার্শবও একটি বর্ণসংকর— ব্রাহ্মণ পিতা ও শূদ্র মাতার সন্তান (হ্যাঁ, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর আগে অবধি ভিন্ন বর্ণে বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল না)।

এশিয়া মাইনরের (ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল) ‘বোঘাজ় ক্যোই লিপি’, যার সময়কাল মোটামুটি খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দী, সেখানে মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র, নাসত্য (অশ্বিনীকুমার), প্রভৃতি ‘বৈদিক দেবতা’র নাম পাওয়া গিয়েছে।  বৈদিক দেবতা ‘মিত্র’, আবেস্তায় উল্লেখিত হয়েছে ‘মিথ্র’ বা উচ্চারণভেদে ‘মিহ্‌র’। সম্রাট কণিষ্কের মুদ্রায় তার নাম আবার ‘মিইরো’। আবেস্তার ‘আহুর মাজদা’ ও ‘অঙ্গর মইন্যু’‒ ঋগ্বেদের ‘অসুর’ ও ‘অঙ্গিরা মুনি’। (‘মাজদা’ শব্দটির অর্থ মহৎধ্যায়ী বা মহান।) অঙ্গিরা মুনি ছিলেন দেবপূজারীদের গুরু, স্বভাবতই তাঁর/ তাঁদের আদর্শ পার্শবদের কাছে ছিল অগ্রহণীয়। সুতরাং, শুভ-অশুভের বিচারে আবেস্তা ও ঋগ্বেদের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। এই বৈপরীত্যের কারণ কী? কথিত আছে, ইন্দ্র ও তার অনুগামীরা ছিলেন ‘সমাজভূমির উর্বরতা বৃদ্ধির’ জন্য পশুবলি বা পশুমেধের পক্ষে, পার্শব বা পারশবেরা ছিলেন এই প্রথার বিপক্ষে!

এই পার্শবদের একটি অংশ আবার ভারতবর্ষে ফিরেছিল। না, পারস্যে ইসলামিক আগ্রাসনের সময় টাটা, গোদরেজ বা মানিকশ্য-এর মতো পার্সিদের বা তাঁদের পূর্বপুরুষদের ভারতে আসার কথা বলছি না। তার বহু আগেই, দাক্ষিণাত্যে সাতবাহন রাজারা পারস্য থেকে একদল সৈন্য নিয়ে আসে— ‘পহ্লব’। ধ্বনি পরিবর্তনে যেভাবে ‘সপ্তাহ’ থেকে ‘হপ্তা’/ ‘হফ্‌তা’ হয় (অর্থাৎ ‘স’ ও ‘প’ ধ্বনিগুলিকে তার নিকটবর্তী/ পরবর্তী ধ্বনি ‘হ’ ও ‘ফ’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে), সেভাবেই ‘পার্শব’-এর ‘র’ ও ‘শ’ ধ্বনিদুটি প্রথমে ‘ল’ ও ‘হ’-এ পরিবর্তিত হয়ে ও তারপর পারস্পরিক স্থান পরিবর্তন করে (ব্যাকরণে যাকে ‘ধ্বনি/ বর্ণ বিপর্যয়’ বলা হয়, বাক্স-বাস্ক বা পিশাচ-পিচাশ-এর মতো) ‘পহ্লব’ শব্দটির সৃষ্টি। তারপর (ধর্ম বা কর্ম যেভাবে ধম্ম বা কম্ম হয়েছে, সেভাবে) তারা ‘পল্লব’ নামেও পরিচিত হয়েছে। শুরুতে সাতবাহন বংশেরই অধীনে সামন্তরাজা হিসেবে থাকার পর খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সাতবাহনদের পতন ঘটলে প্রথম পর্যায়ের স্বাধীন পল্লব রাজবংশের উত্থান পর্ব শুরু হয়। স্বাধীন রাজ্যস্থাপনের পর প্রায় তিনশো বছর রাজধানী কাঞ্চিপুরম থেকে মোটামুটি নির্বিবাদেই শাসনকাজ চালিয়ে গিয়েছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর একদম শেষের দিকে রাজা সিংহবিষ্ণুর হাতে তাঁদের দ্বিতীয় পর্যায়ের রাজত্বকাল শুরু হয়। মহাবলীপুরমের মন্দির পহ্লবদেরই কীর্তি।… ‘পার্শব’ থেকে ‘পহ্লব’— ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে? মাথায় রাখবেন, ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের আগে ‘পাহলভি’ রাজবংশেরই শাসন ছিল। শব্দগুলোর ধ্বনিগত মিল খেয়াল করে দেখুন।

এদিকে যখন পহ্লব বা পল্লবদের রজত্বকাল, পারস্যে তখন ইসলামিক/ আরবিক আগ্রাসনের শুরু। দেখুন, তথাকথিত ‘সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানে’র ধারণাটি আদতে দার্শনিকের স্বপ্নদোষ। বাস্তবে (১) প্রাণের ভয়, (২) পেটের দায়, (৩) বিবাহ বা যৌন সম্পর্ক ও (৪) গভীর হীনমন্যতা ছাড়া কেউই অন্যের সংস্কৃতির গুণমুগ্ধ হলেও নিজেরটি ছেড়ে তাকে আপন করে নেয় না। তবে সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক জাতি হামেশাই কৌশলগত দিক থেকে নিজের সংস্কৃতি ও ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আক্রান্ত জাতি বা গোষ্ঠির নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা তখন হয়ে ওঠে তাদের জাতীয়তাবাদের প্রতীক। তবে এই লড়াইয়ের দৈর্ঘ্য ও ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে দুদিকের ভাষা ও সংস্কৃতির তুলনামূলক সমৃদ্ধির ওপর।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই আরবি ভাষার আধিপত্য সৃষ্টি হলেও সেই হিসেব অনেকটাই উল্টে যায় পারস্যে এসে। আরবের হাতে সেলিক সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, অধিকাংশ পারসিকেরা ইসলাম গ্রহণও করেছে, কিন্তু নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে যায়নি। বলাই বাহুল্য, বেদুইন জাতির ভাষা বা সংস্কৃতির তাদের পারসিক প্রতিরূপের মতো সুবিশাল ঐতিহ্য ছিল না। যুদ্ধজয়ী আরব পারসিক (ফারসি) ভাষার রূপ ও চরিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা করলে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়। ‘শাহনামা’র রচয়িতা মহান ফিরদৌসি, প্রমুখ কবিদের নেতৃত্বে পরসিকেরা রুখে দাঁড়িয়েছিল। এর ফল হয়েছিল চমকপ্রদ। ইসলাম ধর্ম মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরও পূর্বদিকে (ভারতীয় উপমহাদেশে) যাত্রা শুরু করলে আরবির পাশাপাশি ফারসি ভাষাও তার অন্যতম মূখ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, দিনে পাঁচবার প্রার্থনার প্রথাটিও ইসলাম জরাথ্রুস্ট্রীয় ধর্ম থেকে গ্রহণ করেছিল। (চমকে যাওয়ার কিছু নেই, খ্রিস্টানদের রবিবারের উপাসনা সূর্য-উপাশক পেগানদের অবদান। হিন্দুরাও নিরামিষভোজনের অভ্যাস জৈনদের কাছ থেকে পেয়েছে।)

এবার চলে আসুন বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। ১৯০১ সালে ইরানের তৎকালীন শাসক মোজাফফর আল-দিন শাহ এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী, উইলিয়াম নক্স ডি’আর্সিকে তেল অনুসন্ধানের বিশেষ অধিকার দিয়েছিলেন। ঘটনাটা ‘ডি’আর্সি কনসেশন’ নামে পরিচিত। যার সুবাদে ডি’আর্সিকে ৬০ বছরের জন্য পারস্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান, নিষ্কাশন ও বিক্রির একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয়। তবে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে উত্তর ইরানের পাঁচটি প্রদেশ এই চুক্তির আওতাভুক্ত করা হয়নি।

সেই একচেটিয়া অধিকার থেকেই তখন গড়ে ওঠে ‘অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি’। এই বেনিয়া ইংরেজ যে দেশে ব্যবসা করতে ঢুকত, সে দেশের স্বার্থের/ উন্নতির প্রতি যে কতটা যত্নশীল হত— ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কল্যাণে আশা করা যায় যে, এই বিষয়ে ভারতীয়দের নতুন করে কিছু বোঝানোর নেই! শুরু থেকেই ইরানের বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। অ্যাংলো-ইরানিয়ান কোম্পানিটি বিপুল মুনাফা লাভ করলেও ইরান সরকার হাতে পেত লবডংকা, মোট লাভের মাত্র ১৬%!

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এই সমস্ত ঘটনার কিছুদিন পর ব্রিটিশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন শুরু হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, তাঁদের রণতরীগুলিকে জ্বালানি হিসেবে কয়লার বদলে পেট্রোলিয়াম ব্যবহার করা হবে। তখন ব্রিটিশ সরকার এই অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেয়। নতুন নামকরণ হয়, ‘ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম’। ইরানের তেল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

এদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের আবাদান শহরে যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈল শোধনাগার গড়ে ওঠে, কিন্তু সেখানে কাজ করা ইরানি শ্রমিকদের মজুরি ছিল কম। জীবনযাত্রার অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। অন্যদিকে কোম্পানির ব্রিটিশ কর্মচারীরা অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করত। ইরানের শাহ তো রুষ্ট ছিলেনই, এসব বৈষম্যের কারণে ইরানি জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আরও শক্তিশালী হতে শুরু করে। অনেকেই মনে করত যে, দেশের তৈল সম্পদ বিদেশিদের হাতে থাকা স্বাধীনতার পক্ষে অপমানজনক। এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছিল মহম্মদ মোসাদ্দেকের। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়েই খুব দ্রুত তিনি ইরানের তেল শিল্পকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আনেন। এর ফলে সেখানে ব্রিটিশ তেল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যায়। ব্যাপারটা বাণিজ্যিক দিক থেকে তো বটেই, সামরিক দিক থেকেও ইংরেজদের জন্য ছিল একটা বড়ো ধাক্কা। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ব্রিটেন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে, এমনকি ইরানি তেলের বৈদেশিক বাণিজ্য বন্ধেরও চেষ্টা করে। কিন্তু কোনওটাতেই তেমন সুবিধা করতে না পেরে, আমেরিকার কাছে নালিশ করতে ছোটে।

শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। কিন্তু ডি’আর্সি কনসেশনের সময়েও ইরান যে রাশিয়াকে চটাতে চায়, সে ততদিনে পারমাণবিক শক্তিসম্পন্নন সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ঠান্ডা যুদ্ধও তখন মধ্যগগনে। এদিকে ততদিনে পাকিস্তান বারকতক আমেরিকার নেকনজরে আসার চেষ্টা চালালেও ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ায় বাকি দেশগুলো ব্রিটেন ও তার এই বন্ধুর সামনে বিগলিত হচ্ছিল না। চীনে তখন কমিউনিস্ট শাসন। আফগানিস্তানেও কামিউনিস্টরা ঢুকবে-ঢুকবে করছে (পরে, ১৯৭৮ সালের ‘সাওর বিপ্লব’-এর মাধ্যমে সে দেশে বামপন্থী শাসনের সূত্রপাত হয়)।      

এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর ভয় ছিল যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ইরানেও কমিউনিস্ট শক্তি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। অগত্যা, ‘পৃথিবীর শান্তি রক্ষা’র স্বার্থে  CIA ও MI6-এর যৌথ পরিকল্পনায় ১৯৫৩ সালে ইরানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে (যা মার্কিন নথিতে ‘অপারেশন এজ্যাক্স’ আর ব্রিটিশ নথিতে ‘অপারেশন বুট’ নামে পরিচিত) মোসাদ্দেকের নির্বাচিত, গণতান্ত্রিক সরকার ফেলে নিজেদের বশংবদ রেজা পাহলভিকে ইরানের সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া হয়। তেল শিল্পের রাষ্ট্রায়ত্ত কাঠামো ভেঙে একটি নতুন আন্তর্জাতিক তেল কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়। ৪০% নিয়ন্ত্রণ নেয় ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ৪০% নেয় কিছু আমেরিকান কোম্পানি, বাকিটা পায় অন্যান্য কিছু ইউরোপীয় কোম্পানি। আগের তুলনায় ইরান কিছু বেশি ভাগ পেতে শুরু করলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ তখনও বিদেশি কোম্পানির কাছেই থেকে যায়।

ওদিকে ইরানের প্রভুভক্ত শাহ জাতীয় স্বার্থকে পশ্চিমা উদারপন্থার চমক দিয়ে ঢাকার চেষ্টা শুরু করেন। তার নামও দিয়েছিলেন ‘হোয়াইট রেভোলিউশন’! ভূমি সংস্কার, শিল্পায়ন, নগরায়ন, শিক্ষার প্রসার, নারীদের ভোটাধিকার, ইত্যাদি সংস্কারগুলো ইরানকে দ্রুত আধুনিকতার দিকে নিয়ে যেতে শুরু করলেও সেসব সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। মূলত ধর্মীয় নেতৃত্বের অসন্তোষ, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি আর রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবের জায়গা থেকে খোমেইনির মতো কট্টরপন্থীদের উত্থান শুরু হয়। শাহের নির্দেশে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করার জন্য গোপন পুলিশ SAVAK প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফলে সমাজে যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তাতে জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী ও উদারপন্থীরাও কট্টরপন্থীদের সঙ্গে একজোট হতে শুরু করে। এই সময়ে খোমেইনি ধর্মীয় নেতা হিসেবে জনপ্রিয় হতে শুরু করেন। তিনি শাহের নীতির তীব্র সমালোচক ছিলেন; পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন। ১৯৬৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

আরও এগোনোর আগে পশ্চিম এশিয়ার বাকি দেশগুলির তেলে একটু নজর দেওয়া যাক। ইরাকের কিরকুক অঞ্চলে তৈলখনি চালু হয় ১৯২৭-এ; তার বছর পাঁচ-ছয়েকের মধ্যেই বাহরিন, সৌদি আরব আর কুয়েতেও। কিন্তু সব দেশেই তৈলখনিগুলির নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ ও আমেরিকান কোম্পানির হাতে। পৃথিবীীর সবচেয়ে বড়ো তেল কোম্পানি ‘আরামকো’র (বর্তমানে যার নাম ‘সৌদি আরামকো’) পুরো নাম ‘অ্যারাবিয়ান আমেরিকান অয়েল কোম্পানি’; গোড়ায় তা ছিল ‘ক্যালিফোর্নিয়া অ্যারাবিয়ান স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি’।

এমন মোট সাতখানা পশ্চিমা কোম্পানি বা ‘সেভেন সিস্টার্স’ ছয়ের দশক আসা অবধি সারা বিশ্বের তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করত। ছয়ের দশক অবধি মধ্যপ্রাচের কোনও দেশেরই নিজস্ব তেল কোম্পানি ছিল না। তারা তেল ব্যাবসার মুনাফা নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘রয়ালটি’ পেত। তেলের দাম নির্ধারণের অধিকারও মধ্যেপ্রাচ্যের দেশগুলির হাতে ছিল না। মাঝেমাঝেই নতুন তেলের খনি আবিষ্কৃত হত। পশ্চিমা কোম্পানিগুলি নিজের স্বার্থ অনুসারে যখন-তখন দাম কমিয়ে, সস্তায় তেল কিনে উন্নত বিশ্বে চড়া দামে পরিশোধিত তেল বিক্রি করত। ফলে দেশগুলির প্রাপ্য রয়ালটি ও করের পরিমাণও কমে যেত।

এই বৈষম্যমূলক আচরণের কারণেই উৎপাদনকারী দেশগুলি বুঝতে পারে যে, একা লড়াই করে এই বিশাল কোম্পানিগুলির সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। ১৯৫৯ এবং ১৯৬০ সালে যখন কোম্পানিগুলো আবারও একতরফাভাবে তেলের দাম কমায়, তখন তাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। এর সরাসরি প্রতিক্রিয়াই ছিল ‘ওপেক’ (OPEC) গঠন, যাতে দেশগুলি একত্রিত হয়ে তেলের দাম ও উৎপাদনের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি আর ভেনিজুয়েলা ছিল ওপেকের সদস্য। সাতের দশকে ইরান সহ দেশগুলিতে ধাপে ধাপে তেল শিল্পের জাতীয়করণ শুরু হয়ে যায়। পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলির একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে তেল-বাণিজ্যের মুনাফা তখন সরাসরি রাষ্ট্রের হাতে আসতে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এদিকে ইরানে যে রাজনৈতিক অশান্তি শুরু হয়েছিল, সাতের দশকে পৌঁছে তার পরিস্থিতি শাহের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি আমেরিকার সাহায্য চাইলে সদ্য ভিয়েতনামে নাক কাটিয়ে আসা আংকেল স্যাম নতুন কোনও বেইজ্জতি সইতে রাজি ছিল না। এছাড়া ১৯৭৩ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলি ইজরায়েলের পক্ষ নেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটা ছিল বেশ বড়োসড়ো ধাক্কা। তেলের দাম হঠাৎ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পশ্চিমা দেশগুলিতে আরম্ভ হয় জ্বালানি সংকট। দেখতে দেখতেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা তখন মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে (বিশেষ করে সৌদি আরব) কৌশলগত সমঝোতার পথ ধরে। এই সময় থেকেই তথাকথিত ‘পেট্রোডলার ব্যবস্থা’ আরও শক্তিশালী হতে থাকে। আমেরিকার পক্ষে ব্যাপারটা ছিল এক ঢিলে দুই পাখির মতো। নিজেদের জন্য জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত তো হবেই। তার পাশাপাশি তেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একমাত্র বৈধ কারেন্সি হিসেবে ডলারকে বাধ্যতামূলক করে নিজেদের অর্থনীতির পালেও কিছুটা বাতাস সঞ্চার করে। তেল বিক্রি থেকে পাওয়া ডলার মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার অন্তর্গত ব্যাংক বা বন্ডেই ফিরে আসত কিনা!

যাই হোক, ১৯৭৮ সালে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিপ্লবের পর গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা হয়। যারা আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট প্রভাব দূর করতে তালিবানের সৃষ্টি করতে পারে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে, কট্টরপন্থার হাত থাকে ইরানি ম্যাঙ্গোমানবদের বাঁচাতে সেই আমেরিকার আজকে প্রাণ কেঁদে উঠেছে! আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা গড়ে ওঠে (ও এখন চলছে), সেখানে আমেরিকান ডলারই ছিল কেন্দ্রবিন্দু। ক্রেতা-বিক্রেতা যে-ই হোক না কেন, প্রায় ষোলআনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যই ডলারের মাধ্যমে ঘটে। সেটা আমেরিকার অন্যতম অর্থনৈতিক আর কৌশলগত শক্তি। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২ নাগাদ আমেরিকা যেভাবে রাশিয়ার ওপর স্যাংশন চাপিয়ে দিয়েছিল (৯৮ শালে পোখরান কাণ্ডের পর ভারতের ওপরও চাপানো হয়েছিল), তাতে বহুদেশই নড়েচড়ে বসেছে। ইতিহাসে এই প্রথম বহু দেশেরই ফরেন রিজার্ভে ডলারের থেকে সোনার পরিমাণ বেশি হয়েছে (ফলে বাজারে সোনার দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে)। এই পরিস্থিতি আমেরিকার পক্ষে মোটেই সুখকর নয়। বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য খনিজ তেল। অতয়েব ‘ডলার-বাঁচাও আন্দোলনে’ নেমে অন্তত তেলের ব্যবসায় ডলারকে বাধ্যতামূলক রাখতে হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেদের আমদানি কমিয়ে রফতানি বাড়াতে হবে। তারা সেগুলোই করছে। মধ্যপ্রাচ্য, ভেনিজুয়েলা আর রাশিয়া— বিশ্বে এই তিনটে এলাকাই জ্বালানি তেলের মূল উৎস। প্রথমটার জন্য সরাসরি যুদ্ধ, দ্বিতীয়টার জন্য মাদকব্যবসার দোহাই তুলে সরকার ফেলে দেওয়া আর তৃতীয়টার ব্যবসা থামাতে ট্যারিফের হুমকি দেওয়া ছাড়া বেচারা আমেরিকার সামনে বিশেষ একটা পথ খোলা নেই।…

এই যুদ্ধে আপনি পক্ষ নিতেই পারেন। শুধু জেনে-বুঝে, ভেবে-চিন্তে নিন। 

মন্তব্য করুন

Subscribe to Blog via Email

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 4 other subscribers

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সংরক্ষণাগার