পশুপতি
পশ মানে হল প্রবেশ, প্রাপ্তি এবং অবগাহন,
দেখা পাইবার তরে দ্রষ্টার শক্তিবিচ্ছুরণ।
পশ মানে হল সবিশেষে দেখা, সে দেখা বিচক্ষণ।
অবিশেষে কেহ দেখে যদি তবে পশু হয় সেইজন।
◦ √পশ্ মানে সবিশেষে দেখা (discriminating vision) । পশু মানে ‘যে অবিশেষে দেখে’। এখানে উ-কার যোগে শব্দার্থের নবরূপে উত্তরণ দ্র.।
পশ আর উ-এ পশু হয়ে যায়, মানে বুঝে নাও তার।
পশু হলে লোকে অবিশেষে দেখে, বিবেক থাকে না আর।
চোখে ঠুলি দিয়ে ওরা সংসারে নানা কাজ ক’রে যায়,
কলের মতন হয়ে সবিশেষে কিছু না দেখিতে পায়।
◦ ব্রহ্ম সবিশেষ। তাকে কেউ নির্বিশেষ দেখলে সেটি পাশবিক দৃষ্টি। গরু ঘাস আর ফুলের তফাৎ না ক’রে সব একসাথে খেয়ে ফেলে, এটিও পাশবিক দৃষ্টির উদাহরণ। এই বিষয়ে যাস্কের নিরুক্ত দ্র.।
পশুধর্ম্মকে বুঝ ভাল ক’রে, বুঝহ পশুর মন।
বহু মানুষের মাঝে পাওয়া নানা পশুলক্ষণ।
যথা ব্রাহ্মণ ব্রহ্ম না বুঝে পৈতা পরিলে গলে
সেই গর্বিত ব্রাহ্মণ পশু, শ্রীহরিচরণ বলে।
◦ ব্রহ্মজ্ঞান নেই তবু পৈতা পরে নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে গর্ব করে, শাস্ত্রে এমন মানুষকে পশু বলে। এই বিষয়ে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ দ্র.। আজকের দিনে সবাই পৈতা বর্জন করলেই ভাল করবেন। কারণ ব্রহ্মজ্ঞান থাকলেই তিনি ব্রাহ্মণ। এজন্য পৈতা লাগে না। উপনয়ন প্রথা বন্ধ করাই ভাল।
পশু সংসারে আসক্ত হয় ব্রহ্মতত্ত্ব ভুলে।
মহাদেব কৃপা করে যদি তবে ওদের মুক্তি মেলে।
পশুদের পতি বলে মহাদেব পশুপতি নাম পান,
সেই যজমান মূর্ত্তি দেখিতে নেপালে চলিয়া যান।
আত্মতত্ত্ব বিস্মৃত হয়ে দক্ষ হইল ছাগ,
তাহাতে শিবের হইল দুঃখ এবং ভীষণ রাগ!
তবু যজমান হয়ে শিব সব পশুর সঙ্গে রয়,
কর্ম্মযজ্ঞ পরিচালনার কর্ম্মে লিপ্ত হয়।
◦ পশুপতি শিব স্বয়ং যজমান।
পশু তান্ত্রিক সাধকবিশেষ, তিনি সংযতকাম।
মদ্যের ঘ্রাণ পাইলেও তিনি করিবেন প্রাণায়াম।
শুদ্ধাচারেতে নিরামিষ খেয়ে পশু হন পূজারত,
ঋতুকাল ছাড়া নাহি হন স্বীয় পত্নীতে উপগত।
◦ এখানে পশু মানে animal নয়, বরং একপ্রকার তান্ত্রিক সাধক। এই বিষয়ে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধান ও তন্ত্র গ্রন্থসমূহ দ্র.।
শিব, দুর্গা ও বিষ্ণুর পূজা নিত্য করে যে জন
তন্ত্রের মতে তেমন মানুষ ‘উত্তম পশু’ হন।
আমি বলি,”পূজা ক’রে উত্তম পশু হয়ে লাভ নাই।
মানুষ যখন বিবেক জাগিয়ে হয়ে যা মানুষটাই।”
◦ নিত্য নিত্য দুর্গাপূজা ইত্যাদি করে ‘উত্তম পশু’ হবার দরকার নেই। বরং নাস্তিকতা ও সমাজতন্ত্রের পথে যাওয়া ভাল। কার্ল মার্কসের মতো তান্ত্রিক সাধুরা তাই বলেন।
কাব্যরসাদি না বুঝিলে কেহ পশু বলা হয় তায়,
তাহার সঙ্গে মেলামেশা করা হয় যে বিরাট দায়।
সেই মূঢ় লোক লোমলাঙ্গুলসাস্নাযুক্ত নয়,
তাহাকে কাব্য শুনাইতে গেলে বিপদে পড়িতে হয়!
পশু মানে হল যজ্ঞের বলি, যেমতি অজ বা ছাগ।
ধর্ম্মের নামে পশু বলি দিলে নাস্তিক করে রাগ।
মনের পশুকে বলি দাও যদি হতে পারে কিছু কাজ,
দেবস্থানেতে পশুবলি পুরা বন্ধ কর হে আজ।
◦ কালীপূজায় পাঁঠাবলি বন্ধ করা দরকার। মুসলিম ভাইয়েরা কোরবানিতে পশুবলি বন্ধ করলেই ভাল করবেন। মাংস খেতে হলে কসাইয়ের দোকানে যান।
পশু শব্দতে গো মহিষ আদি চারপেয়ে জীব হয়,
উহাদের পীড়া দেওয়া আমাদের সমীচীন কাজ নয়।
পশুপ্রেমীগণ পশু ভালবাসে, উহাদের খুব যশ।
পশুপতি আজও নরপশুদের করিতে পারেনি বশ।
◦ গোরু, মহিষ ইত্যাদিকে পশু বলে। এটি পশু শব্দের প্রতীকী অর্থ।
… ‘বর্ণসঙ্গীত’।
আলোচনা:
- পশু শব্দের polysemy ও তার ক্রিয়াভিত্তিক ব্যাখ্যা বলা হল।
- গভীরে গেলে শিব শব্দতত্ত্ব ব্যতীত কিছুই নয়।
- সঙ্গের ছবিটি নেপালের পশুপতি মন্দিরের (AI generated ছবি)।এই প্রাচীন শিবমন্দিরটি নেপালের বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত। এই মন্দিরের শিবমূর্তিটি যজমান মূর্তি, যা শিবের অষ্টমূর্তির অন্যতম। ধন্যবাদ।
সাম্প্রতিক মন্তব্য