Select Page

যারা গাঁজা খায়, তারা খাক

যারা গাঁজা খায়, তারা খাক

গাঁজা বা সিদ্ধি বা মারিজুয়ানা বা ক্যানাবিস আবহমানকাল ধরে ব্যবহৃত একটি ভেষজ উপাদান। সাধু-সন্ন্যাসী-ফকির-পাগলদের কেউ-কেউ এটি সেবন করে থাকেন। এটি গ্রহণ করলে মন বেশ একটু শান্ত, আনন্দময়, অন্তর্মুখী, একমুখী ও সৃজনশীল হয়ে ওঠে। সাধু-ফকিরদের একাংশ জাগতিক জটিলতা এড়িয়ে ধ্যানমুখী হবার জন্য সহায়ক উপাদান হিসেবে এটি গ্রহণ করেন। এটি ভাবগানের সাথে জপ-জিকিরে মিলতেও সহযোগিতা করে।

শিল্পী-লেখক-কবি-গায়ক প্রভৃতি সৃজনশীল লোকেরাও অনেকে এটি গ্রহণ করেন তাদের সৃষ্টিকর্মের সহযোগী হিসাবে। শিল্পী এস এম সুলতানের সিদ্ধিসেবন কিংবদন্তিতুল্য ইতিহাস। সাধারণ নাগরিকেরাও অন্তত তরুণ বয়সে অনেকে বিনোদন ও আড্ডার উপকরণ হিসাবে এটি সেবন করেন।

পৃথিবীর অনেক দেশে চিকিৎসার উপকরণ হিসাবে গাঁজা ব্যবহৃত হয়। অনেকদেশে এটি আইনত ব্যবহার ও বিপণনযোগ্য উপাদান। চিত্তবিনোদনের একটি উপকরণ হিসেবেও এটি সমাদৃত।

আমাদের দেশে গাঁজা সব সময় বৈধ ছিল। সরকারি আবগারিতে এটি বিক্রি হতো। নওগাঁয় গাঁজা উৎপাদন ছিল বিখ্যাত ঘটনা। এখনও সেখানে গাঁজা সোসাইটির বিশাল অফিস ভবন, গুদামঘর ইত্যাদি স্থাপনা রয়েছে। এদেশের অর্থনীতিতে গাঁজার বিরাট অবদান ছিল।
 
বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে গাঁজার একটা সম্মানিত অবস্থান আছে। শিবঠাকুর সিদ্ধি বা ভাঙের সরবত পান করতেন বলে প্রসিদ্ধি আছে। এখনও অনেক স্থানে শিব চতুর্দশীতে উৎসব করে সরবত পান করা হয়।
বস্তুগুণে ক্যানাবিসকে ড্রাগসের আওতায় ফেলা হয়। কিন্তু মাদকের মধ্যে এটি সম্ভবত সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। এমনকি বিড়ি-সিগারেট, যা মাদকের তালিকায় নেই, তার চেযেও গাঁজা কম ক্ষতিকর বলে জানা যায়। আর ড্রাগস বলতে যে-সকল সিনথেটিক বা রাসায়নিক বস্তু আছে : হেরোইন, ইয়াবা, আইস, এলএসডি ইত্যাদির তুলনায় গাঁজা নিতান্ত নিরীহ।
 
আর মদ তো বৈধ জিনিসই। এদেশে মদ তৈরির কোম্পানি কেরু অ্যান্ড কোং প্রতিবছর বিশাল মুনাফা লাভ করে। শহরে শহরে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং অবৈধ অজস্র মদের বার রয়েছে। বিদেশ থেকেও বৈধ ও অবৈধভাবে প্রচুর মদ আমদানি হয়। ভদ্র লোকজন বারে, হোটেলে, ক্লাবে, বাড়িতে নিয়মিত মদ্যপান করে থাকেন।
 
নেশার মানদণ্ডে মদ এবং ইয়াবা ইত্যাদি ড্রাগস শরীরে উত্তেজনা আনে। মাতলামি, হৈ চৈ, মারামারি, ধর্ষণমূলক আচরণ ইত্যদি মদ ও উত্তেজক ড্রাগস খেয়ে লোকে করে। গাঁজার ভূমিকা এর বিপরীত। গাঁজা খেয়ে কেউ চিৎকার করে না, বরং গান গায়। গাঁজা খেয়ে কেউ মারামারি করে না, বরং পারস্পরিক ভালোবাসার আবেগ বাড়ে। গাঁজা খেয়ে খুন-ধর্ষণ-বলাৎকার করার কোনো নজির নাই। বরং কয়েকজন গঞ্জিকাসেবী একসাথে বসে আনন্দ আড্ডায় মেতে ওঠে।
 
আমাদের ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে, পেশাগত পরিবেশে, সমাজে, রাষ্ট্রে নিত্যনিয়ত যে বিবিধ সংকট তার মধ্যে কিছু সময় রিলাক্সেশন ও রিফ্রেশমেন্টের জন্য কিছু মানুষ গাঁজা সেবন করে। হয়তো কোনো উদ্যান কিংবা নিরিবিলি পরিবেশ কিংবা যেখানে আরও গঞ্জিকাসেবী সমবেত হয়, সেখানে গিয়ে এটি গ্রহণ করে। কিন্তু আইনত বাংলাদেশে এটি অবৈধ। তাই তারা অনেকসময় পুলিশি হামলায় পর্যুদস্ত হয়।
 
বাংলাদেশে গাঁজা অবৈধ হয় কবে থেকে? বাংলাদেশে ১৯৮৭ সালে গাঁজা চাষ এবং ১৯৮৯ সালে এর বিক্রি ও সেবন আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। স্বৈরশাসক (কোন শাসক স্বৈরাচারী নয় বাংলাদেশে?) হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের আমলে এই নিষেধাজ্ঞা আসে। জেনেভা কনভেনশনের অজুহাতে নিরীহ গাঁজা নিষিদ্ধ হলেও, কোনো অজুহাত ছাড়াই আশির দশকের শুরু থেকে ফেনসিডিল ও হেরোইনের বিপুল অবৈধ আমদানি ও ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তী কালে ইয়াবা, আইস ইত্যাদি আসে। আর এগুলো যে কত মারাত্মক পর্যায়ের ড্রাগস তা তো আমরা জানিই। দেশের যুবসম্প্রদায়ের বিরাট অংশের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে গেল এইসব ড্রাগসের কারণে।
 
কিন্তু আইনত নিষিদ্ধ হলেও গাঁজার ব্যবহার তো থেমে থাকে নাই। অবৈধভাবে গাঁজার সরবরাহ ঠিকই বহাল আছে। তার গুণগত মান প্রায়শই কম এবং মূল্য ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে ।
 
সাম্প্রতিক কালে কোনো কোনো মাজারে ও মেলায় পাগল-ফকিরেরা সমবেত হয়ে সিদ্ধিসেবন করলে কিংবা পার্কে বা অন্য কোনো নিরিবিলি জায়গায় সাধারণ মানুষ কিংবা লেখক-কবি-শিল্পীরা একটু সমাজের আড়ালে বসে গাঁজা খেলে আইনরক্ষা বাহিনি ও তৌহিদি জনতার প্রবল আপত্তি, হামলা, মারধর, গ্রেফতার ইত্যাদি কার্যক্রম প্রবল হয়ে উঠছে।
 
সোহরাওয়ার্দী পার্কে যেসব পুলিশি ধরপাকড় হচ্ছে তার যেসব ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে, দেখলেই মায়া লাগে। নিরীহ, শান্ত, দুঃখী কোনো কোনো মানুষ নিরিবিলিতে বসে গাঁজার সিগারেট তৈরি করছে। ব্যস পাকড়াও। জীবনের ঝামেলায়, দুঃখে, অশান্তিতে একটু ধোঁয়া খেয়ে কেউ যদি কিছুক্ষণের প্রশান্তি লাভ করে তাতে কার কী ক্ষতি?
 
এইসব বলপ্রয়োগ করে গাঁজা সেবন বন্ধ করা যাবে না। যাদের প্রয়োজন তারা ঠিকই কোনো না কোনোভাবে তা সংগ্রহ করে নেবে। আর গাঁজাকে আমরা যতখানি নিচু চোখে দেখি, ততটা হেয় করারও কিছু নেই। এরকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত আছে : মদ্যপান বেশ একটা স্মার্ট আধুনিকতা আর গঞ্জিকা নিচুশ্রেণীর মানুষের গরিবি উপকরণ।
 
কিন্তু সাধু-সন্ন্যাসী-ফকির-পাগলেরা নেশা করেন না, তারা সিদ্ধিসেবন করেন উপাসনার আঙ্গিকে। কল্কিধারণ করে কপালে ঠেকিয়ে ভক্তি নিবেদন করে, মহাদেব কিংবা গুরু কিংবা লেংটা কিংবা অন্য কোনো ভক্তিভাজন মহাজনের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করে তারপর সিদ্ধি গ্রহণ করেন। এটা তাদের ধর্মচর্চার অনুষঙ্গ।
 
আমার-আপনার ধর্মচর্চায় এর স্থান না থাকলে আমরা এসব গ্রহণ করব না। কিন্ত এর প্রতি ঘৃণাপ্রবণ ও আক্রমণাত্মক হওয়াটা সমাজের বিভক্তি ও দ্বন্দ্বকেই প্রবল করে তোলে। যার যার কর্ম সে সে করুক, অন্যের জন্য ক্ষতিকর কিছু না ঘটলেই হলো।
 
আইনেরও করবার ও দেখবার মতো অনেক কিছু আছে। নিরীহ কিছু গঞ্জিকাসেবীকে অহেতুক ঝামেলায় না ফেলে বরং গাঁজার অজুহাতে যারা মাজারে-দরবারে হামলা চালায় তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়াটাই জরুরি। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইনক্লুসিভ তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে চাইলে এই বিষয়টা ইতিবাচক দৃষ্টিতে সহনশীলতার সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ডিসক্লেইমার : আমি গাঁজা সেবন করি না। কোনো এককালে করতাম, তাই এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্যকভাবে জানি। কাউকে গাঁজা সেবনে উৎসাহিত করছি না। যারা সেবন করেন তাদের দিকটি সহৃদয়ভাবে বিবেচনার জন্যই এই লেখা।

মন্তব্য করুন

Subscribe to Blog via Email

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 4 other subscribers

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সংরক্ষণাগার