মহৎ থেকে অহঙ্কার এবং মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা ও শ্রমবিভাজন
Posted by শুভাশিস চিরকল্যাণ পাত্র | মে ২৫, ২০২৬ | প্রবন্ধ, মাটি | 0
“প্রথমে প্রকৃতি স্থূলা, অহঙ্কারে লক্ষকোটি।” ... রামপ্রসাদ।
সীমার হনন মহ হয়ে যায়, বন্ধন তার যায়।
মহর আধার মহা শব্দতে সবকিছু মিলে যায়।
মহা শব্দতে অখণ্ড মোট আর সমগ্র হয়।
মহান লোকেরা প্রকৃতিতে মহা বন্ধনে বাঁধা রয়।
ম বর্ণে সীমায়ন ও হ বর্ণে হনন, তাই মহ মানে সীমা হনন ক’রে সব মিলে যাওয়া। যারা নিজ নিজ সীমা ভুলে সবার কথা ভাবতে পারেন তারা মহান।
মহানেরা নিজেদের কথা ভুলে সমাজের কাজে রয়।
ওরা স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক লোক নাই তাতে সংশয়।
পুরাকালে লোকে একসাথে মিলেমিশে ছিল এই দেশে।
পুঁজির বিকাশ হইলে একতা ভেঙে যায় অবশেষে।
মহেঞ্জোদারো শব্দের মানে ‘মৃতদের স্তূপ’ হয়।
সেই সভ্যতা কিছুটা সাম্যবাদীদের মতো হয়।
মহান পুরুষ, মহিয়সী নারী ছিল সে সভ্যতায়।
রাজার প্রাসাদ আর মন্দির সেথা নাহি দেখা যায়।
বায়ু পুরাণেতে স্বাভাবিক লোকদের বর্ণনা পাই।
উহাদের মনে রাগ, মোহ, দ্বেষ আদি বদগুণ নাই।
তখন আদৌ রাষ্ট্র ছিল না, নাহি ছিল কোনো রাজা।
পুরাণ বলিছে সেই লোকেদের লাগিত না কোনো সাজা।
বায়ুপুরাণ আধুনিক anthropology লিখছে না, তবু এক আদিম সাম্যাবস্থার কল্পনা সেখানে পাই।
মর্গান বলে,”ইরোকোয়াসেরা গণতান্ত্রিক হয়।”
এঙ্গেলস বলে,”উহারা আসলে স্বভাবসাম্যে রয়।”
আদিম কালের সাম্যের কথা আরো অনেকেই কয়।
ইরোকোয়াস আর বায়ু পুরাণের লোকেদের মিল রয়।
মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা ভারতের আদিম সাম্যবাদী সমাজের শেষ রূপ হওয়া সম্ভব। তাদের ‘মহান’ নামে ডাকা হত এমন নয়, তবে তারা মহান প্রকৃতির মানুষ ছিলেন বলে মনে করি। সেখানে বর্ণাশ্রম ছিল না এবং তাঁরা অনেকটা সাম্যবাদী চরিত্রের ছিলেন। কিছু শ্রমবিভাজন ছিল। বিশাল রাজপ্রাসাদ নেই, পিরামিডসদৃশ রাজকীয় সমাধি নেই, দেবতাদের মূর্তি বা মন্দির নেই। সেখানে মন্দিরকেন্দ্রিক সংগঠিত ধর্মের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায় না।
প্রকৃতির থেকে হইল মহৎ তা থেকে অহঙ্কার—
পঁচিশ তত্ত্বে সৃষ্টি ব্যাখ্যা করেন সাংখ্যকার।
কপিল বলেন সকল সৃষ্টি, কেবল ভৌত নয়।
মোরা সমাজেও পেতে পারি তাঁর তত্ত্বের পরিচয়।
“প্রকৃতের্মহান মহতোঽহঙ্কারঃ” — সাংখ্য, ১.৬১। সাংখ্যের সৃষ্টি তত্ত্ব জগৎ সৃষ্টি, সমাজের সৃষ্টি, ভ্রূণের বিকাশ …. সবকিছুর দার্শনিক আলোচনায় প্রয়োগ করা যায়।
মহ থেকে ‘হম’, তাহার পূর্বে অ জুড়ে অহম হয়।
অহঙ্কারীরা হম ভুলে গিয়ে অহমের কথা কয়।
দক্ষজ্ঞান হইলে সমাজে আসে যে অহঙ্কার।
সে অহঙ্কারে সমাজ ফাটিলে মহৎ থাকে না আর।
মহ শব্দটিকে উল্টে দিলে ‘হম’ হয় (যেমন হিংসা থেকে সিংহ হয়, সেইরকম)। হিন্দীতে ‘হম’ মানে ‘আমরা’, ‘আমাদের‘। হম-এর আগে অ জুড়লে অহম হয়, তখন আর একতা থাকে না। অহম মানে আমি। দক্ষযজ্ঞ মানে specailist-দের দ্বারা চালিত উৎপাদন কর্মযজ্ঞ। দক্ষযজ্ঞে সাম্যবাদী সমাজ ভেঙে যায়। এই প্রসঙ্গে মার্কসের শ্রম বিভাজন তত্ত্ব স্মরণীয়। দক্ষযজ্ঞের কাহিনী শিবপুরাণে বিস্তারিত আছে, অবশ্যই ক্রিয়াভিত্তিক পাঠ নিতে হবে। দক্ষকে এখানে শুধু ব্যক্তি নয়; skill monopoly, technical authority, prestige economy—এসবের প্রতীক হিসাবে নিতে হবে।
বৈদিক যুগ এল যবে দেশে মাণব পড়িল বেদ।
তার ফলে তারা মানব হইল, বেড়ে গেল ভেদাভেদ।
বর্ণাশ্রম আসে ও সমাজ টুকরা টুকরা হয়,
যেমতি সাংখ্যে প্রকৃতি হইতে নানান তত্ত্ব হয়।
মহেঞ্জোদারোর পরে বৈদিক যুগ। তখন বর্ণাশ্রম ও শ্রমবিভাজন দেখা যায়। সাংখ্য এক আদিম প্রকৃতির বিভাজন থেকে জগৎ সৃষ্টি বর্ণনা করে।
মানব যূথের আধার মহিলা, গাই তাহাদের জয়।
আজও মহিলারা গিন্নী হইয়া পুরা সংসার বয়।
নারীকেন্দ্রিক সমাজে মহিলা পাইতেন বহু মান,
আমি তাই গাই সেই মহিয়সী মহিলাদিগের গান।
মহিলা শব্দে নারী হয়, তবু পুরুষ ‘মহিল’ নয়।
‘মহিল’ না হোক, মাহালি মানুষ মেদিনীপুরেতে রয়।
মহিকান নামে উপজাতি আছে দূর মার্কিণ দেশে।
ক্রিয়াভিত্তিক বিধি মেনে দেখ সকল শব্দ মেশে।
…’বর্ণসঙ্গীত’।
আলোচনা:
খান-চক্রবর্ত্তী বৈদিক পূর্ববর্তী যুগকে মহানদের যুগ বলেছেন। ওদের মতে মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা হল মহানদের যুগের শেষ অধ্যায় এবং মহ-যুক্ত শব্দগুলিতে ওই যুগের গন্ধ আছে। মহেঞ্জদারো শব্দের অর্থ কী এবং তার সঙ্গে মহান শব্দের কোন সম্পর্ক আছে কি? এই প্রসঙ্গে কলিম খান রবি চক্রবর্ত্তী বলেন,“আমাদের জ্ঞানবুদ্ধি মতে ঐ মহান দ্বারা জাত সমাজব্যবস্থাই (বা মহান-জ-দারুই) পরবর্তী কালে ‘মহেঞ্জোদারো’ কথাটিতে পরিণত হয়েছে। বলে রাখা ভাল দক্ষযজ্ঞই সমস্ত প্রাচীন নগরসভ্যতার ধ্বংসের মূল কারণ।”—ব.শব্দার্থ, ২.৫২৪।
আমার মতে লেখকদ্বয়ের মহেঞ্জোদারো শব্দের অর্থের এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁরা নিজেরাও এই বিষয়ে নিঃসংশয় ছিলেন না যা ‘আমাদের জ্ঞানবুদ্ধি মতে’ কথাগুলি থেকে বুঝা যেতে পারে। মহেঞ্জোদারো মানে ‘মৃতের স্তূপ’ এবং আমার মতে এই প্রচলিত অর্থটি একদম ঠিক। তবু কলিম খানের ব্যাখ্যা সৃজনশীল এবং তাঁর কথার দার্শনিক দিকটি আমরা ভেবে দেখতে পারি। তিনি প্রাচীন কালের মহান নামে একশ্রেণীর মানুষের কথা বলার চেষ্টা করেছেন যারা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা গড়েছিল। মহান মানুষরা কেমন ছিলেন এই প্রসঙ্গে তিনি তাঁর ‘মৌলবিবাদ থেকে নিখিলের দর্শনে’ গ্রন্থে বায়ু পুরাণকে উদ্ধৃত ক’রে বলেছেন,“ধর্ম্মাধর্ম্মভাব ছিল না, সকলেই নির্বিশেষ ছিল… সকলেই নিজ নিজ অধিকারে থাকিয়া বাস করিত।… তখন ক্ষমা, তুষ্টি, দম এসকল সকলেরই ছিল। রূপ, আয়ু স্বভাব ও ক্রিয়া দ্বারা সকলেই সমান ছিল। কাহারও বিন্দুমাত্র বিশেষত্ব লক্ষিত হইত না।… তাহারা স্বভাব বশেই কর্ম্ম করিত… বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা ছিল না। কাহারই লোভ বা দ্বেষ ছিল না, অধম উত্তম ভাব ছিল না।” মর্গান ও এঙ্গেলস আমেরিকার ইরোকোয়াস গোত্রের আদিম সাম্যবাদী মানুষদের যে বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে বায়ুপুরাণে বর্ণিত সমাজের এই বর্ণনা অনেকটাই মিলে যায়, যা কলিম খানকে চমৎকৃত করেছে। মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা এমনই ছিলেন কিনা ইতিহাসের পণ্ডিতরা সেকথা বিবেচনা করবেন। আমার বক্তব্য এই যে, প্রাচীনকালে দেশে তেমন মহান প্রকৃতির মানুষের কথা আমরা ভাবতে পারি, কিন্তু মহান নামধারী এক শ্রেণীর মানুষের কথা পুরাণে সরাসরি নেই এবং মঞ্জোদারো নামের সঙ্গেও তা সরাসরি যুক্ত নয়।
সাংখ্য মতে প্রকৃতি থেকে ক্রমান্বয়ে মহৎ, অহঙ্কার, একাদশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চতন্মাত্র, পঞ্চভূত ইত্যাদি তত্ত্বগুলি আসে। এগুলি ভৌত সৃষ্টির বর্ণনা। এর মধ্যে ঈশ্বর, আত্মা, মানুষ বা তার গড়া সমাজের কথা নেই। পুরুষ এগুলি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি তত্ত্ব যা প্রকৃতির লীলার দর্শক। তবু সাংখ্যে বর্ণিত ভৌত সৃষ্টির সমান্তরালে মানবসমাজেও অনুরূপ বিবর্ত্তনের কথা ভাবা যায়। আমি ব্যক্তির মোক্ষকে (বিবেক খ্যাতি) ছাড়িয়ে সাংখ্যতত্ত্বকে অর্থনীতি ও ইতিহাসে প্রয়োগ করা সম্ভব।
খান-চক্রবর্তীর মতে মহৎ মানুষ দক্ষজ্ঞানের অধিকারী হলে তার মনে অহংবোধের জন্ম হয়। জ্ঞানের মর্য্যাদা (ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট বা মেধাসত্ত্বের আদিরূপ) প্রতিষ্ঠার পর ‘আমি করেছি’ বলা নিন্দনীয় থাকে না। এইভাবে আদিম সমাজে অহঙ্কারের উদ্ভব হয়। সাংখ্যদর্শনে:“প্রকৃতের্মহান মহতো’হঙ্কারঃ।” হরিবংশে: “সর্বাগ্রেতে মহত্তত্ত্ব হইল সমুদ্ভব/ তাহা হতে অহঙ্কার হইল উদ্ভব।” কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে: “মহতের পুত্র হইল নাম অহঙ্কার।” রামপ্রসাদের গানে: “প্রথমে প্রকৃতি স্থূলা, অহঙ্কারে লক্ষকোটি।” এগুলি ভৌত সৃষ্টির বর্ণনা হিসাবে যেমন দেখা যায়, তেমনি মানুষের মধ্যে মহত্ত্ব ও অহঙ্কার কীভাবে আসে তার এক সমান্তরাল বর্ণনা হিসাবেও দেখা যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবন ও বর্ণমালা’ প্রবন্ধে অহঙ্কার শব্দের বর্ণভিত্তিক অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন,“আমাদের বর্ণমালা অহং শব্দের একটি ব্যাখ্যা। অ দিয়ে তার শুরু, হ দিয়ে শেষ।” বিন্দুরূপিনীকে বাদ দিলে বাংলাভাষার বর্ণমালা অ দিয়ে শুরু হ দিয়ে শেষ। কবিগুরু বলতে চেয়েছেন শুরু থেকে শেষতক সবটাই আমার ভাবলে অহঙ্কার হয়। অবশ্য কবিগুরু তাঁর ‘জীবন ও বর্ণমালা’ প্রবন্ধে বর্ণমালার রহস্য সম্পূর্ণ ভেদ করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর প্রয়াস প্রশংসনীয় এবং রচনাটি কেবল মজার রচনা নয়। মৎপ্রণীত ‘বর্ণসঙ্গীত’ অভিধানটিকে শব্দের বর্ণভিত্তিক অর্থ দিয়ে কবিগুরুর এই স্বপ্নকে সার্থক করার চেষ্টা হিসাবে দেখতে পারেন।
মাণব মানে প্রাচীন যুগের মানুষ, যারা বেদপাঠ করেনি এবং তখনও মনুর জন্ম হয়নি। মানব (মনুর পুত্র) এসেছে পরে (অবশ্যই মনুর পরে) এবং তারা আগেকার মাণবদের অনুকম্পার চোখে দেখেছে। মহেঞ্জোদারোর যুগে বর্ণাশ্রম ছিল না। তারপর কর্ম্মের ভিত্তিতে বর্ণবিভাজন এবং অবশেষে দক্ষযজ্ঞ যার ফলে যৌথ সমাজ ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। দক্ষযজ্ঞ মানে দক্ষ মানুষদের কর্ম্মযজ্ঞ। অহঙ্কার যৌথ সমাজে ফাটল ধরায়। সাংখ্যে প্রকৃতি থেকে মহৎ হয়ে যেমন নানা তত্ত্ব জন্মায় তেমনি মানুষের অহঙ্কারের ফলে মানবসমাজেও ভাঙন আসে। দক্ষযজ্ঞই সমাজে এই বিস্ফোরণ ঘটায়। শিবপুরাণে তার বিস্তারিত বর্ণনা পাবেন, অবশ্যই ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায়।
‘সরল শব্দার্থকোষ’ মহিলা শব্দের সঙ্গে মহান শব্দের যোগ উল্লেখ করেছে। আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজের নারীর স্বভাব এখনও গিন্নিমাদের ভিতরে দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরা সাম্যবাদী চরিত্রের এবং স্বজন পরিজনের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ও সমমর্য্যাদায় মমতা, আবেগ ও খাদ্যাদি পরিবেশন করেন।
মেদিনীপুরে আছে মাহালি উপজাতি। আমেরিকাতে মহিকান (mohican) নামে একটি উপজাতি আছে। মূল শব্দটি সম্ভবতঃ Muhheakunnuk যার অর্থ মহান বা বড় নদীর তীরের মানুষ। এদের সমাজসংগঠন কেমন ছিল (সাম্যবাদী ছিল কিনা) সে আমি জানি না। কিন্তু মহ, মহৎ, মহিকান, মাহালি ইত্যাদি শব্দগুলির মধ্যে ক্রিয়াভিত্তিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার দরকার আছে। মতামত কাম্য। ধন্যবাদ।
লেখক ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থবিধির চর্চাকারী।
Share:
সাম্প্রতিক মন্তব্য